ভোটের গল্প : তুবার প্রথম ভোট
ভোটের গল্প : তুবার প্রথম ভোট
ভোটের গল্প :
তুবার প্রথম ভোট
শফিকুল আলম টিটন
বাসা থেকে বেরিয়ে হন হন করে হেঁটে যাচ্ছে মাসুদ। মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ঝাঁকড়া চুল আউলা ঝাউলা হয়ে আছে। কতদিন মাথায় চিরুনি পড়েনি বলতে পারবে না ও।
পাড়ায় পাড়ায় ভোটের মিছিলের গরম। মাঘের শীতে ঘরে ঘরে যেমন পিঠা তৈরির ধুম, তেমনি ভোটার লিষ্ট নিয়েও লোকজনের আনাগোনা চলছে জোরেশোরে।
বহু বছর পর দেশে যেনো আনন্দের ধুম পড়ে গেছে। সবার মুখে হাসি। ঈদের আনন্দ যেনো থই থই সুখ অনাবিল হাসি ঝলক দিয়ে উঠছে।
সবাই বারো তারিখ ভোট দিতে যাবে। তুবার মনে তো আনন্দের বান ডেকেছে। এই প্রথম ভোট দিতে যাবে ও। বার বার ওর জাতীয় পরিচয় পত্রটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। ভোটের লিস্টের কাগজ দিয়ে গেছে বাসায়। ওর ভোটার নাম্বারটাও ঘুরে ফিরে দেখছে। কিছুক্ষণ পর পর মায়ের কাছে জানতে চায়
মা, কাকে ভোট দেবো ?
মা হাসে। এক চিলতে হেসে বলে যেই মানুষটা ভালো তাকেই ভোট দিবি।
সবাই তো ভালো মা? কাকে দিলে ভালো হয়।
সবগুলো লিফলেট গুলো পড়ে দেখ, কে কি করতে চায়। যারা দেশের জন্যে করবে, যাদের চিন্তা ভাবনা "সবার আগে বাংলাদেশ"। যারা মধ্যবিত্ত আর গরিবদের ভালো রাখার কমিটমেন্ট করে, ভালো সুযোগ সুবিধা দেবে, রেশন সুবিধা, ফ্যমিলি কার্ড দেবে, তাদেরকেই ভোট দিবি।
আচ্ছা মা।
ঘর থেকে বেরিয়ে খালামনির বাসার দিকে ছুটলো তুবা।
ধলপহর। লাল সূর্যটা সবে মাত্র উঁকি মারতে শুরু করেছে। হাঁটতে হাঁটতে একটা পার্কের সামনে এসে দাঁড়ায় মাসুদ। ছোট ছোট সবুজ ঘাস যেনো প্রাণ খুলে হাসছে। এক পাশে দোলনায় ছোট ছোট শিশুরা দোলনায় দোল খাচ্ছে। ট্রাউজার পড়ে কেউ কেউ ভোরের ব্যায়াম করছে। দলবেঁধে হাঁটছে পার্কের সরু লম্বা রাস্তা ধরে।
মাসুদ ধীরে ধীরে পার্কের বেঞ্চিতে গিয়ে বসে। এই নিরিবিলি পার্কে এসে বসলেই মনে পড়ে যায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের লোমহর্ষক ঘটনাগুলো।
অনেক জীবনের বিনিময়ে শকুন, স্বৈরশাসকের হাতকে গুড়িয়ে দিয়ে এই দেশকে মুক্ত করেছে। গুলি খেয়ে গুরুতর আহত হয়েছে মাসুদ। সময় পেলেই বার বার ক্ষত স্থানে হাত বুলিয়ে দেখে ও। তাজা লাল রক্তে ভেসে গিয়েছিল দেশ। অনেক কষ্টের শ্বাস ছাড়ে ও।
ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠে ও।
সারি সারি গাছ শুদ্ধ অক্সিজেন ছড়িয়ে দিচ্ছে একটু শান্তির শ্বাস নিতে। শিশিরভেজা দুর্বা ঘাসগুলো যেনো কাঁদছে মাসুদের সাথে সাথে । প্রতিদিন আপন মনে পার্কের গাছগুলোর সাথে কথা বলে ও। মন খুলে কাঁদে।
- তুমি কাঁদছ কেনো ?
একটা ছোট্ট শিশুর কন্ঠ কানে ভেসে এলো।
-তোমার মনে এমন কি কষ্ট ? তুমি রোজ রোজ পার্কে এসে কাঁদো ।
শিশুটির কথা শুনে ধীরে ধীরে তাকায় ওর দিকে। ছোট্ট একটা মেয়ে। মাসুদ তাকাতেই মিষ্টি একটা হাসি উপহার দিয়ে বলে, আমার নাম রিয়া। আমি প্রতিদিন ভোরে এখানে দোলনা চড়তে আসি মায়ের সাথে।
এবার না হেসেই পারলো না মাসুদ।
- তুমি খুব মিষ্টি মেয়ে। খুব ভালো মেয়ে ।
- ওমা তাই। মা তো আমায় দুষ্টু মেয়ে বলে।
- না সোনা। তুমি খুব ভালো মেয়ে। ঠিক আমার ছোট বোনটির মত।
- তোমার বোনের নাম কি ? জানতে চায় রিয়া।
- তুবা। ঠিক তোমার মত দেখতে। কিন্তু তোমার চেয়ে বয়সে বড়।
- তাই। ওকে একদিন আনো না এখানে। আমি খেলব ওর সাথে। দোলনায় দুলবো আমরা দুজন। হাঁটবো, অনেক মজার মজার গল্প করব।
রিয়ার সাথে কথা বলতে বলতে পুরোনো স্মৃতিগুলো আবারো মনে পড়ে যায়।
- আমরা তখন গাঁয়ের বাড়ি ছিলাম। এই দেশের অত্যাচারী স্বৈরশাসকের আর তার শকুনিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে ছাত্র জনতাসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষগুলো। এই দেশকে শকুন মুক্ত করতে হবে। পুলিশ নির্বিচারে গুলি করেছে ছাত্র জনতার ওপর। যাকে পারছে তাকেই মারছে। আধা মরা করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে জ্যান্ত মানুষগুলোকে। ছিটেফোঁটা দয়া মায়া নাই মানুষ নামের পশুগুলোর।
সেকি যুদ্ধ ! এই দেশটাকে বাঁচাতে নেমে পড়লো ছাত্র, তরুণ, যুবক, আর দেশের সকল আমজনতা। আমি ছাত্র। আমিও এই দেশটাকে বাঁচাতে দেশ বাঁচানোর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। বাসায় রেখে যাই মা বাবা আর তুবাকে।
আমি কখনও ভাবিনি এই যুদ্ধে বেঁচে যাবো। পুলিশ অনর্গল গুলি ছুঁড়ে মেরেছে। গুলি খেয়ে হাসপাতালের বিছানায় বিনা চিকিৎসায় যন্ত্রণা আর কষ্ট পেয়ে মারা গেছে । অনেকে বেঁচে গেছে। তাদের মধ্যে আমিও একজন।
অবশেষে আমরা জয়ী হই ।
সারা দেশে যখন অনাবিল আনন্দে ফেটে ফেটে পড়ছিল তখন আমি ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি আনন্দ মিছিলে অংশগ্রহণ করার জন্যে ।
ঢাকায় আসার পর যখনই সময় পাই ভোরবেলা নিরিবিলি এই পার্কে বসে প্রকৃতির সাথে কথা বলি।
বহুদিন পর নির্বাচনের আমেজ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। যারা ভোট দিতে পারেনি এতদিন তারাও ভীষণ খুশি। আমিও। বহু বছর পর ভোট দেবো।
এতক্ষণ হা করে মাসুদের কথা শুনছিল রিয়া ।
আমার ছোট বোন প্রথমবারের মত ভোট দেবে। ভীষণ খুশি ও।
জানো ভাইয়া আমিও ভোট দেবো। আমি তো ছোট তাই মায়ের সাথেই ভোটকেন্দ্রে যাবো। বলতে বলতে রিয়াও
হো হো করে হেসে ওঠে। এমন সময় পেছন থেকে কে যেন ডেকে উঠলো।
রিয়া মা ? তুমি কি করছ এখানে।
রিয়ার সপ্রতিভ জবাব "আসছি মা"। বলতে বলতে রিয়া মায়ের কাছে ছুটে যায়।
ততক্ষণে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মাসুদ। আজ দেশের মানুষ খুশি। ভোটের আমেজ নিয়ে সবাই দলবদ্ধভাবে নানা খোশগল্পে মেতে উঠছে। বাসায় ফিরতেই তুবা ছুটে এলো।
ভাইয়া তুমি কোথায় ছিলে ? কত জায়গায় খুঁজে এসেছি তোমায়। মাসুদকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে তুবা।
সত্যি ভাইয়া। তোরা যদি দেশ রক্ষার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে না পড়তি তাহলে আজ আমি ভোট দিতে পারতাম না। জীবনে প্রথম ভোট দেবো। কি যে আনন্দ লাগছে জানিস। মনটা ধুকফুক করছে। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেবো।
তুই কাকে ভোট দিবি বোন?
"সবার আগে বাংলাদেশ"। যারা এই দেশটাকে প্রায়োরিটি দেবে আমি তাকেই ভোট দেবো।
একদম। ঠিক বলেছিস। "সবার আগে বাংলাদেশ"।
হুম। তুবা তৃপ্তির হাসি হেসে বলে, বারো তারিখ আসছে না কেনো ভাইয়া। অধীর অপেক্ষায় আছি ভোট দেওয়ার জন্যে।
আসবে। আসবে। এইতো আর দুদিন পর ভোট দিতে যাবি ভোটকেন্দ্রে। সবার সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিবি। আমিও তোর সাথে যাবো ভোট কেন্দ্রে।
হঠাৎ মিছিলের শব্দ কানে ভেসে এলো ওদের,
"আমার ভাই, তোমার ভাই, -----------"
ভোট দেবো কিসে ? ---------
মাসুদ আর তুবা এক দৌড়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়,
ভোটের লম্বা মিছিল ওদের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। তুবা মুষ্টিবদ্ধ হাতে বলে ওঠে, সবার আগে বাংলাদেশ।
ততক্ষণে ভোটের মিছিল অনেক দূর পেরিয়ে গেছে। মাসুদ আর তুবা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভোটের মিছিলের দিকে।
(সমাপ্ত)
ঠিকানা :
শফিকুল আলম টিটন
মিরপুর - ৬, ঢাকা - ১২১৬।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Banglar Alo News Admin
কমেন্ট বক্স